শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

ছাত্র রাজনীতির বদলে যাওয়া চিত্র

শাহরাস্তিতে ছাত্রদলের নেতৃত্বে গড়ে উঠছে কর্মনির্ভর আদর্শবাদী প্রজন্ম

রাফিউ হাসান হামজা প্রকাশিত: শুক্রবার, ১ আগস্ট, ২০২৫, ৭:৩৩ পিএম
শাহরাস্তিতে ছাত্রদলের নেতৃত্বে গড়ে উঠছে কর্মনির্ভর আদর্শবাদী প্রজন্ম

যেখানে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে ছাত্র রাজনীতি মানেই হিংসা, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার—সেই বাস্তবতার মাঝেও চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলা ছাত্রদল তৈরি করছে এক ব্যতিক্রমী, প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এখানকার ছাত্রনেতারা প্রমাণ করছেন, শিক্ষা, কর্মজীবন ও রাজনীতি—এই তিন ধারার সুসমন্বয় ঘটিয়েও গড়া যায় এক আত্মনির্ভর, নীতিনিষ্ঠ ও জনকল্যাণে নিবেদিত নেতৃত্ব।

★ আদর্শের পাঠশালায় নেতৃত্ব গড়ার উদ্যোগ

শাহরাস্তি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার এবিএম পলাশ একজন সফল চাকরিজীবী। তাঁর ভাষায়, “ছাত্র রাজনীতি আমার কাছে কেবল মতাদর্শ নয়—এটি নেতৃত্বের বাস্তব পাঠশালা। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালনের মধ্যেই আমি রাজনীতির প্রকৃত রূপ খুঁজে পাই।”

সদস্য সচিব মো. আজগর হোসেন মিয়াজি একজন ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠক। যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আফজাল হোসেন, শাহ নেওয়াজ টিপু, মো. ইব্রাহিম ও শামীম আশরাফ এঁরা প্রত্যেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন নিজ নিজ পেশায়। কেউ ব্যবসায়, কেউ কর্পোরেট সেক্টরে, কেউবা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে দেখাচ্ছেন নেতৃত্ব মানে কেবল মিছিল নয়, দায়িত্বও।

Model Hospital

★পৌর নেতৃত্বে আত্মমর্যাদার রাজনীতি

শাহরাস্তি পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম জুয়েল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ব্যবসায়ী হিসেবে। তিনি বলেন, “রাজনীতি করি মানুষের অধিকার আদায়ে। নিজের উপার্জনে জীবন চালাই যাতে নীতির সঙ্গে আপস করতে না হয়।”

পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইমাম হোসেন ও সদস্য সচিব তানভির হোসেন সোলায়মান-ও ব্যক্তিগত কর্মজীবনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। তাঁদের কাছে নেতৃত্ব মানে সততা, আদর্শ ও কাজের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন।

★ ইউনিয়ন পর্যায়ে নেতৃত্বে শিক্ষার সঙ্গে পেশার সমন্বয়

সূচীপাড়া উত্তর ইউনিয়নের গাজী সানি, সূচীপাড়া দক্ষিণের নূর নবী দিপু, রায়শ্রী উত্তরের গাজী আবু সালেহ ও জাহিদ হাসান ফয়সাল তাঁরা সবাই শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি টেলিকম, আইটি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, সেলস-মার্কেটিং ইত্যাদি খাতে সক্রিয়। তাঁদের পথচলা দেখায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত থাকা।

জানা গেছে, শাহরাস্তি ছাত্রদলের প্রায় ৬০ শতাংশ নেতাকর্মী কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ৬ জন প্রাইভেট চাকরিজীবী, ৫ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ৪ জন মার্কেটিং খাতে, এবং আরও অনেকে সেবামূলক পেশায় বা উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি চাকরির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।

➤ প্রবাসে থেকেও রাজনৈতিক অঙ্গীকার অটুট

৫ আগস্টের আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে শাহরাস্তির ছাত্রদলের অনেক নেতাকে দেখা গেছে জীবিকার প্রয়োজনে প্রবাসে যেতে। চিতোষী ইউনিয়নের মহিউদ্দিন, টামটা উত্তরের জুয়েল হোসেনসহ ৭-৮ জন নেতাকর্মী বর্তমানে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। বিদেশে থেকেও তাঁরা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে দেশে ফিরে আবার দায়িত্ব নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন।

✪ ভিন্ন ধারা, আশাবাদের দিগন্ত

শাহরাস্তির এই ছাত্রনেতারা রাজনীতিকে দেখছেন স্বার্থসিদ্ধির পথ নয়, বরং সমাজ গঠনের হাতিয়ার হিসেবে। তাঁদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা গড়ে উঠছে শিক্ষা, পেশা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনকল্যাণের ভিত্তিতে।

স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা মনে করেন-

“এই তরুণদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, আত্মনির্ভরতা এবং নীতির প্রতি নিষ্ঠা। যদি এ ধারাটি দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তবে ছাত্র রাজনীতি আবারো ফিরে পাবে তার হারানো মহিমা।”

শাহরাস্তির ছাত্রদল দেখাচ্ছে- ছাত্র রাজনীতি হতে পারে গঠনমূলক, আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও সমাজবান্ধব। এখানে রাজনীতি মানে দায়িত্ব, নেতৃত্ব মানে সেবা। এই চর্চা শুধু একটি দলের নয়, বরং গোটা দেশের ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্যই এক আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’