শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

রাস্তা না থাকায় পৌঁছাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস

হাজীগঞ্জের হাটিলায় আগুনে পুড়লো ঘর; দগ্ধ বাবা-ছেলে

সাইফুল ইসলাম সিফাত প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ৪:০৮ পিএম
হাজীগঞ্জের হাটিলায় আগুনে পুড়লো ঘর; দগ্ধ বাবা-ছেলে

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার ৮নং হাটিলা পূর্ব ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের পশ্চিম হাটিলা মজুমদার বাড়িতে গভীর রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একটি বসতঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলের উপযোগী রাস্তা না থাকায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি দমকল বাহিনী। এতে দগ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন বাবা-ছেলে। গুরুতর আহত রুবেলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত প্রায় ১টার দিকে রুবেল (৩০), পিতা- দেলোয়ার হোসেনের বসতঘরে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মুহূর্তেই আগুন পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তীব্রতায় ঘরের সকল আসবাবপত্র ও মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। একই সঙ্গে পাশ্ববর্তী একটি বিল্ডিংয়ের এক পাশের দেয়ালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত রুবেল বলেন, “পাশের ঘর থেকে আগুন আগুন বলে চিৎকার শুনে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। পরে সকলে এসে দেখি ঘরটি দাউদাউ করে জ্বলছে। আমরা চেষ্টা করেছি আগুন নেভানোর, কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সবকিছু পুড়ে যায়।”

অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হন রুবেল ও তার ১০ বছর বয়সী ছেলে মিহির। খবর পেয়ে হাজীগঞ্জ থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গুরুতর আহত রুবেলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

Model Hospital

হাজীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সৌরভ হাদি বলেন, “রাত তখন শেষের দিকে। আহতরা কোনো যানবাহন না পাওয়ায় আমরা তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করি। পরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।”

হাজীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল মান্নান বলেন, “খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়েছে।”

তবে এই ঘটনায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে পশ্চিম হাটিলা গ্রামের সড়ক সংকট। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এলাকাটিতে এখনো জরুরি সেবা পৌঁছানোর উপযোগী একটি প্রশস্ত সড়ক নির্মিত হয়নি। আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস রওনা দিলেও সংকীর্ণ রাস্তার কারণে তাদের গাড়ি ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে পারেনি। ফলে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে স্থানীয় গ্রামবাসী নিজেরাই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। ততক্ষণে একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয় ও স্বপ্ন আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায়।

স্থানীয়রা জানান, একটি উপযুক্ত সড়কের অভাবে বছরের পর বছর ধরে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস কিংবা অন্যান্য সেবাদানকারী যানবাহন এলাকায় প্রবেশ করতে না পারায় সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়।

এদিকে এলাকাবাসী স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকের প্রতি দ্রুত পশ্চিম হাটিলা এলাকায় রাস্তা প্রশস্তকরণ ও একটি টেকসই সড়ক নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, “আজ আগুনে একটি ঘর পুড়েছে, কাল হয়তো কোনো প্রাণহানি ঘটবে। আমরা শুধু এমন একটি রাস্তা চাই, যেখান দিয়ে বিপদের সময় ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে।”

পশ্চিম হাটিলার এই অগ্নিকাণ্ড যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—একটি রাস্তা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, অনেক সময় সেটিই মানুষের জীবন রক্ষার শেষ ভরসা।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’