শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

শাহরাস্তিতে চাঞ্চল্যকর মিম হত্যা: ডাকাতি নয়, পরিবারের ভেতরেই খুনি!

মো. মাসুদ রানা প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ১০:২৪ পিএম
শাহরাস্তিতে চাঞ্চল্যকর মিম হত্যা: ডাকাতি নয়, পরিবারের ভেতরেই খুনি!
শাহরাস্তিতে প্রথমে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে প্রচার পাওয়া গৃহবধূ রিগান আক্তার মিম (২৬) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে শাহরাস্তি মডেল থানা পুলিশ।
ঘটনার মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করে নিহতের দেবরের স্ত্রী কাজী সুমাইয়া আক্তার মিনা (২৩)-কে গ্রেপ্তার করে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তিনি বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে নিজের বড় ভাসুরের স্ত্রী (জ্যা) রিগান আক্তার মিমকে গলাটিপে হত্যার কথা স্বীকার করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পারিবারিক ঈর্ষা ও দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
গত ১৪ জুলাই মঙ্গলবার দিবাগত রাতে শাহরাস্তি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বার্ত্তলা মহল্লার বেপারী বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মিম মৃত সেলিম বেপারীর ছেলে সাইফুল আলম রনির স্ত্রী। তিনি আড়াই বছর বয়সী কন্যা সাইফা ও চার মাস বয়সী ছেলে সিরাজের জননী। ঘটনার সময় বাড়িতে দুই গৃহবধূ, পরিবারের প্রবীণ সদস্য সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম এবং তিনটি শিশু ছিল।
ঘটনার পর কাজী সুমাইয়া নিজেই ডাকাতির নাটক সাজিয়ে নিজেকে আহত দাবি করেন এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হামলার বর্ণনা দেন। কিন্তু ঘটনাস্থলের আলামত, প্রযুক্তিগত তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তার বক্তব্যের অসঙ্গতি বিশ্লেষণ করে পুলিশের তদন্তকারী দল দ্রুত হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন। পরে নিবিড়ভাবে প্রায় তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার বর্ণনা দেন এবং আদালতেও একই বক্তব্য প্রদান করেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ক্রাইম সিন সংরক্ষণ, আলামত সংগ্রহ এবং রহস্য উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁদপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশ সুপারের প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে সহকারী পুলিশ সুপার (কচুয়া সার্কেল) মো. আব্দুল হাই চৌধুরী, শাহরাস্তি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান, তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ পুলিশের একটি চৌকস টিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে কাজ করে।
ঘটনার রাতে প্রতিবেশীরা চিৎকার শুনে ছুটে এসে মিমকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। তার গলায় ওড়না পেঁচানো ছিল। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
খবর পেয়ে নিহতের স্বজনরা ছুটে এলে দুই শিশু সন্তানকে ঘিরে তাদের আহাজারিতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতের স্বামী সাইফুল আলম রনি শুরু থেকেই সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
বৃহস্পতিবার রাতে গণমাধ্যমকে শাহরাস্তি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, “ঘটনার পরপরই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়। পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় একটি বিশেষ টিম গঠন করে ঘটনাস্থলের আলামত, প্রযুক্তিগত তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। ডাকাতির গল্প সাজিয়ে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পুলিশ প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে।
আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা মো. কবির হোসেন বাদী হয়ে শাহরাস্তি মডেল থানায় মামলা নং-২৫, তারিখ ১৫ জুলাই ২০২৬, পেনাল কোডের ৩০২ ধারায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার তদন্তেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে পুলিশ।
এদিকে, মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের পর নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা শাহরাস্তি মডেল থানা পুলিশের তৎপরতা ও পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে তাদের ধন্যবাদ জানান এবং এ তদন্তকে দৃষ্টান্তমূলক বলে অভিহিত করেন।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’