শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

 চারদিনেও কচুয়ায় নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি কেউ!

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২১, ৫:০৫ পিএম
 চারদিনেও কচুয়ায় নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি কেউ!

মো: রাছেল, কচুয়া : কচুয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত তিন কলেজ শিক্ষার্থীর পরিবারের আহাজারি থামছে না।

গত ২৫ নভেম্বর কচুয়ার কড়ইয়া গ্রামের কাদির ডাক্তারের বাড়ি সংলগ্ন এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় শিক্ষার্থী উর্মি মজুমদার, সাদ্দাম হোসেনর ও মাহবুব আলম রিফাত। উর্মি ও সাদ্দাম কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের মাস্টার্স পরীক্ষার্থী।

অপরজন মাহবুব আলম রিফাত চাঁদপুর সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষার্থী। তারা তিন জনই পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে একই সিএনজি যোগে কলেজের উদ্দেশ্যে হাজীগঞ্জ যাচ্ছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ওদের পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ ও আর বাড়ি ফিরা হয়নি। বিআরটিসি বাস ও সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে তিন জনেরই প্রাণ কেড়ে নিল।

দোয়াটি গ্রামের উর্মি মজুমদারের স্বপ্ন ছিল উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে শিক্ষকতার পেশায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করবে। উর্মির ছোট ভাই শুভ জানান, আমরা তিন বোন এক ভাই। প্রায় ৮ বছর আগে কুয়েতের এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবাকে হারাই। বোন উর্মি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের মুখ উজ্জ¦ল করবে, গড়ে তুলবে আলোকিত সমাজ। এমনি আশায় আমরা বুক বাঁধি।

Model Hospital

নিশ্চিন্তপুর গ্রামের আব্দুল মান্নান মজুমদারের ছেলে সাদ্দাম উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করে প্রশাসনিক ক্যাডার হয়ে দেশ সেবায় আত্মনিয়োগ করার স্বপ্ন লালন করে আসে। তাঁর ভাই স্কুল শিক্ষক ইসমাইল হোসেন জানান, আমরা পাঁচ ভাই দুই বোন। ছোট ভাই সাদ্দাম একজন স্বপ্ন বিলাসি মানুষ ছিলেন। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সে কঠোর অধ্যাবসায় চালিয়ে যাচ্ছিল। বাবা আব্দুল মান্নান মজুমদার ও মা মমতাজ বেগম স্বপ্ন বিলাসি পুত্র সাদ্দামকে হারিয়ে প্রায় বাকরুদ্ধ। সাদ্দাম প্রায় দেড় বছর পূর্বে বিয়ে করে। তাঁর রয়েছে তিন মাসের এক পুত্র সন্তান। স্ত্রী আছমা আক্তার স্বামীকে হারিয়ে অবুঝ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। তাঁর ও পরিবারের অন্য সদস্যদের কান্না যেন কেউ থামাতে পারছে না।

অপর নিহত কোয়া গ্রামের মফিজুল ইসলামের ছেলে মাহবুব ইসলাম রিফাত সরকারও সদ্য বিবাহিত ছিলেন। স্ত্রী রিয়া আক্তার আছমার মতই বারা বার স্বামীর স্মৃতিচারণ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন। তাঁর বোন শামীমা আক্তার জানান, আমরা তিন ভাই এক বোন। অভাবি সংসারে লেখাপড়া করে ভবিষ্যতে বিবিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসনিক ক্যাডার পদে চাকরি করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। মা হালিমা বেগম জানান, আমার স্বামী বৃদ্ধ হওয়ায় ছেলে কর্মকরে সংসার চালাতো ও পাশাপাশি পড়াশোনা করতো। এখন আমার সংসারে হাল ধরবে কে? এমনি ভাবনায় আমি কোন কুলকিনারা পাচ্ছি না।

তিন পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভের সাথে বলেন, আপনারা সাংবাদিক ছাড়া জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কেউ আমাদের খোঁজ খবরটুকু নিতে আসেনি। আমরা যাতে এ কষ্ট সইতে পারি সে জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করবেন। তবে এ ধরণের দুর্ঘটনায় আর কারো মায়ের কোল যেন খালি না হয় এটাই আমাদের কাম্য। মামলা মোকদ্দমা দায়ের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিন পরিবারের সদস্যরাই অভিন্ন মতামত প্রকাশ করে বলেন, মামলা করে আমরাতো আর তাদেরকে ফিরে পাবো না।

কচুয়া থানার ওসি মো. মহিউদ্দিন জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কেউ কোন প্রকার অভিযোগ করেনি। আমরা অপেক্ষায় আছি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। নিহতদের পরিবার চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে লাশ দাফন করেছে। আমরা ঘাতক বিআরটিসি বাসটিকে আটক রেখেছি। বাসের চালককে কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’