ঢাকা ০১:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে বিক্রি হওয়া সেই নবজাতক ফিরল মায়ের কোলে

সাইদ হোসেন অপু চৌধুরী : সন্তান জন্মদানের পর হাসপাতালের খরচ শোধ করার মতো সামর্থ ছিল না চাঁদপুরের এক দম্পতির। অর্থ জোগাড় করতে না পেরে আড়ালে ছিলেন সন্তানের বাবা আলম। কিন্তু, ঝামেলায় পড়ে যান মা তামান্না বেগম। খরচ মেটাতে সদ্যজাত সন্তানকে বিক্রি করে দেন এক প্রবাসীর স্ত্রীর কাছে। নিজের সন্তানকে আদর করার সুযোগও পাননি তিনি। গত বুধবার সন্তানকে অন্যের কোলে দেওয়ার পর থেকেই পাগলপ্রায় ছিলেন সেই মা।

Model Hospital

এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পরই নজরে আসে প্রশাসনের। অবশেষে মায়ের কোল ফিরে পায় সেই নবজাতক। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল এলাকা থেকে নবজাতককে উদ্ধার করে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, এক প্রবাসীর স্ত্রী ওই নবজাতককে অর্থের বিনিময়ে দত্তক নিয়েছিলেন। তাঁদের তিন মেয়ে সন্তান রয়েছে। তাই, ছেলে শিশুটিকে লালনপালন করার জন্য নিয়েছিলেন।

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাজী মো. শরিফুল হাসান বলেন, ‘নবজাতকের মা ও নানি স্বীকার করেছেন, মূলত আর্থিক সমস্যার কারণে প্রবাসীর স্ত্রীর কাছে শিশুটি বিক্রি করে দেন। পরে আমরা বিষয়টি জানতে পারি এবং রাতে ষাটনল এলাকা থেকে নবজাতককে উদ্ধার করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিই।’

আলম-তামান্না দম্পতির দুই সন্তান রয়েছে। তামান্না গত ২৬ জানুয়ারি প্রসব বেদনা নিয়ে ভর্তি হন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার পালস-এইড জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে সিজারের মাধ্যমে জন্ম হয় তৃতীয় সন্তানের। হাসপাতাল ও ওষুধের ব্যয় বহন করতে না পেরে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে সে ফুটফুটে ছেলেসন্তানকে এক দম্পত্তির কাছে বিক্রি করে দেন তামান্না।

তামান্না ছেংগারচর পৌরসভার বারোআনি গ্রামের বাসিন্দা। পাঁচ বছর আগে পাশের হানিরপাড় গ্রামের দিনমজুর আলমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।

অসহায় তামান্না বেগম বলছিলেন, ‘হাসপাতালে অপারেশনের পরপরই টাকা চাওয়া হয়। আমি গরিব মানুষ, টাকা দেব কোথা থেকে? একজন আমাকে বিনামূল্যে রক্ত দিলেও হাসপাতালে রক্তের বিল দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। অপারেশন, ওষুধপত্র আর আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ৪০ হাজার টাকা হয়। কারও কথায় আমি সন্তান দিইনি। পরে যখন হাসপাতালের বিল পরিশোধ এবং নিজের চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারছিলাম না, তখনই সন্তান বিক্রির সিদ্ধান্ত নিই। যদিও এর আগে কাউসার নামের একজন সন্তান বিক্রি করব কি না আমার কাছে জানতে চান। পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে একজনের সঙ্গে কথা বলে ৫০ হাজার টাকায় আমার সন্তানকে বিক্রি করে দিই।’

সন্তানকে বিক্রির পর তামান্না বেগম বলেছিলেন, ‘আমার স্বামী আমাকে তাঁর সন্তান ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। তা না হলে আমার সঙ্গে আর সংসার করবে না বলেও হুমকি দিয়েছে। তখন টাকার জন্য সন্তানকে বিক্রি করলেও এখন আমার সন্তানের জন্য কষ্ট হয়। আমি আমার সন্তানকে ফিরে পেতে চাই। জানি না আমি আমার সন্তানকে পাব কি না। কারণ, তাঁরা আমার কাছ থেকে স্ট্যাম্প করেছে, এ সন্তান আমি আর কোনোদিন দাবি করতে পারব না। তার ওপর ৫০ হাজার টাকা আমার মতো গরিব মানুষ কীভাবে তাঁদের দেবে। জানি না আমার সন্তান এখন কোথায় আছে, কেমন আছে।’

এ বিষয়ে হাসপাতালের মালিক প্রতিনিধি লিমন সরকার বলেছিলেন, ‘বাচ্চা বিক্রির বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবগত নয়। তাঁরা আমাদের বিশেষ কিছু জানাননি। সর্বশেষ গত দুদিন আগে যখন তিনি অপারেশনের সেলাই কাটতে আসেন তখনও আমরা তাঁর বাচ্চা কেমন আছে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, বাচ্চা ভালো আছে।’

ট্যাগস :

কেক কাটার মধ্য দিয়ে “প্রিয় চাঁদপুর” এর ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে বিক্রি হওয়া সেই নবজাতক ফিরল মায়ের কোলে

আপডেট সময় : ০১:২০:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২২

সাইদ হোসেন অপু চৌধুরী : সন্তান জন্মদানের পর হাসপাতালের খরচ শোধ করার মতো সামর্থ ছিল না চাঁদপুরের এক দম্পতির। অর্থ জোগাড় করতে না পেরে আড়ালে ছিলেন সন্তানের বাবা আলম। কিন্তু, ঝামেলায় পড়ে যান মা তামান্না বেগম। খরচ মেটাতে সদ্যজাত সন্তানকে বিক্রি করে দেন এক প্রবাসীর স্ত্রীর কাছে। নিজের সন্তানকে আদর করার সুযোগও পাননি তিনি। গত বুধবার সন্তানকে অন্যের কোলে দেওয়ার পর থেকেই পাগলপ্রায় ছিলেন সেই মা।

Model Hospital

এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পরই নজরে আসে প্রশাসনের। অবশেষে মায়ের কোল ফিরে পায় সেই নবজাতক। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল এলাকা থেকে নবজাতককে উদ্ধার করে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, এক প্রবাসীর স্ত্রী ওই নবজাতককে অর্থের বিনিময়ে দত্তক নিয়েছিলেন। তাঁদের তিন মেয়ে সন্তান রয়েছে। তাই, ছেলে শিশুটিকে লালনপালন করার জন্য নিয়েছিলেন।

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাজী মো. শরিফুল হাসান বলেন, ‘নবজাতকের মা ও নানি স্বীকার করেছেন, মূলত আর্থিক সমস্যার কারণে প্রবাসীর স্ত্রীর কাছে শিশুটি বিক্রি করে দেন। পরে আমরা বিষয়টি জানতে পারি এবং রাতে ষাটনল এলাকা থেকে নবজাতককে উদ্ধার করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিই।’

আলম-তামান্না দম্পতির দুই সন্তান রয়েছে। তামান্না গত ২৬ জানুয়ারি প্রসব বেদনা নিয়ে ভর্তি হন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার পালস-এইড জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে সিজারের মাধ্যমে জন্ম হয় তৃতীয় সন্তানের। হাসপাতাল ও ওষুধের ব্যয় বহন করতে না পেরে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে সে ফুটফুটে ছেলেসন্তানকে এক দম্পত্তির কাছে বিক্রি করে দেন তামান্না।

তামান্না ছেংগারচর পৌরসভার বারোআনি গ্রামের বাসিন্দা। পাঁচ বছর আগে পাশের হানিরপাড় গ্রামের দিনমজুর আলমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।

অসহায় তামান্না বেগম বলছিলেন, ‘হাসপাতালে অপারেশনের পরপরই টাকা চাওয়া হয়। আমি গরিব মানুষ, টাকা দেব কোথা থেকে? একজন আমাকে বিনামূল্যে রক্ত দিলেও হাসপাতালে রক্তের বিল দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। অপারেশন, ওষুধপত্র আর আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ৪০ হাজার টাকা হয়। কারও কথায় আমি সন্তান দিইনি। পরে যখন হাসপাতালের বিল পরিশোধ এবং নিজের চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারছিলাম না, তখনই সন্তান বিক্রির সিদ্ধান্ত নিই। যদিও এর আগে কাউসার নামের একজন সন্তান বিক্রি করব কি না আমার কাছে জানতে চান। পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে একজনের সঙ্গে কথা বলে ৫০ হাজার টাকায় আমার সন্তানকে বিক্রি করে দিই।’

সন্তানকে বিক্রির পর তামান্না বেগম বলেছিলেন, ‘আমার স্বামী আমাকে তাঁর সন্তান ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। তা না হলে আমার সঙ্গে আর সংসার করবে না বলেও হুমকি দিয়েছে। তখন টাকার জন্য সন্তানকে বিক্রি করলেও এখন আমার সন্তানের জন্য কষ্ট হয়। আমি আমার সন্তানকে ফিরে পেতে চাই। জানি না আমি আমার সন্তানকে পাব কি না। কারণ, তাঁরা আমার কাছ থেকে স্ট্যাম্প করেছে, এ সন্তান আমি আর কোনোদিন দাবি করতে পারব না। তার ওপর ৫০ হাজার টাকা আমার মতো গরিব মানুষ কীভাবে তাঁদের দেবে। জানি না আমার সন্তান এখন কোথায় আছে, কেমন আছে।’

এ বিষয়ে হাসপাতালের মালিক প্রতিনিধি লিমন সরকার বলেছিলেন, ‘বাচ্চা বিক্রির বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবগত নয়। তাঁরা আমাদের বিশেষ কিছু জানাননি। সর্বশেষ গত দুদিন আগে যখন তিনি অপারেশনের সেলাই কাটতে আসেন তখনও আমরা তাঁর বাচ্চা কেমন আছে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, বাচ্চা ভালো আছে।’