শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

কর্মসংস্থান সৃষ্টির দৃষ্টান্ত: মিশ্র খামারে স্বপ্ন পূরণ কচুয়ার প্রবাসী আবু নাছেরের

মোঃ রাছেল, কচুয়া প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫, ১:২৪ পিএম
কর্মসংস্থান সৃষ্টির দৃষ্টান্ত: মিশ্র খামারে স্বপ্ন পূরণ কচুয়ার প্রবাসী আবু নাছেরের

কচুয়ার কাদলা গ্রামের বিলে গাড়ল ও মিশ্র খামারে সফল আবু নাছের।

মালয়েশিয়ায় বহু বছর প্রবাস জীবন কাটিয়ে নিজের এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন আবু নাছের মিয়াজী। সেই স্বপ্নই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে ‘আল হামিদ এগ্রো ফার্ম’-এ। কচুয়া উপজেলার ৮নং কাদলা ইউনিয়নের কাদলা গ্রামের বিলের মাঝখানে কচুয়া সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে বিস্তীর্ণ প্রকৃতির মাঝে গড়ে উঠেছে এই ব্যতিক্রমী মিশ্র খামার।

জানা যায়, ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠার পর তিন বছরের ব্যবধানে আল হামিদ এগ্রো ফার্মে যুক্ত হয়েছে নানা সম্ভাবনাময় উৎপাদন। ফার্মে বর্তমানে রয়েছে-শতাধিক গাড়ল, প্রায় ২ হাজারেরও বেশি হাঁস, ভেড়া প্রায় ১০০টি, ছাগল, দুটি পুকুরে বিভিন্ন জাতের মাছ এবং বিদেশি প্রজাতির নারিকেল ও সুপারি গাছ।  এই বৈচিত্রপূর্ণ চাষাবাদ ও পশুপালনের কারণে খামারটি এখন এলাকাবাসীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিনই অনেকে খামারটি দেখতে আসেন। প্রবাস থেকে ফিরে নিজ এলাকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যই ছিল আবু নাছের মূল অনুপ্রেরণা। গাড়ল পালন এখন পুরো কাদলা এলাকায় আলোচনার বিষয়। আগের ভেড়ার জায়গা দখল করে নিয়েছে গাড়ল। আকারে বড়, মাংস উৎপাদন বেশি, দ্রুত বংশবৃদ্ধি-এসব কারণে গাড়ল পালনকে ভবিষ্যতে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তা।

স্থানীয়রা জানান, আবু নাছের মিয়াজীর এই উদ্যোগ কাদলা ইউনিয়নসহ পুরো কচুয়া উপজেলার তরুণদের মধ্যে নতুন উদ্যম সৃষ্টি করেছে। অনেকেই তার খামার দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন নিজস্ব উদ্যোগে কৃষি ও পশুপালন খাতে বিনিয়োগ করতে।

Model Hospital

উদ্যোক্তা আবু নাছের মিয়াজী বলেন, দেশে ফিরে ভেবেছিলাম এমন কিছু করব, যাতে আমার এলাকার মানুষ কাজ পায়। বিদেশ থেকে সংগ্রহ করা নারিকেল ও সুপারি গাছ এখন অনেকটাই বড় হয়েছে। গাড়ল, হাঁস, মাছ-সব মিলিয়ে একটি বড় এবং আধুনিক খামার গড়ে তুলতে চাই। বর্তমানে খামারে ১০-১২ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। খাবার সরবরাহ, মাছের ট্যাংকের তদারকি, গাছের পরিচর্যা-সব কিছুই চলে নিয়মমাফিক।

তিনি আরোও জানান, “প্রবাসে থেকে সবসময় ভাবতাম নিজের দেশে কিছু করার। দেশে ফিরে সিদ্ধান্ত নিলাম স্বপ্নের খামার গড়ে তুলব। এখন আল্লাহর রহমতে ভালোই চলছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার ইচ্ছা আছে।  ছাগলের পাশাপাশি হাঁসের ডিম উৎপাদন এবং ছানা বিক্রয়ের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে চাহিদা বাড়ছে। সঠিক পরিচর্যা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও রোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিচ্ছেন তিনি।

কচুয়ার কাদলা গ্রামের বিলে গাড়ল ও মিশ্র খামারে সফল আবু নাছের।

ফার্মের ম্যানেজার বশির উল্যাহ রোকন বলেন,উদ্যোক্তা আবু নাছির মিয়াজীর পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে খামারটি এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এলাকার কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যেই তিনি এ উদ্যোগ নিয়েছেন।

শ্রমিকেরাও খামারের সাফল্যে গর্বিত। তারা জানান, আমরা এখানে কাজ করে সন্তুষ্ট। নিয়মিত পারিশ্রমিকে পরিবারের খরচ চলে যায়। প্রতিদিন গাড়লকে ঘাস, ধানসহ বিভিন্ন খাবার খাওয়াই।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো: সাওকাত হোসেন সুমন বলেন, কচুয়া উপজেলায় প্রথমবারের মতো গাড়ল পালনের উদ্যোগ নিয়েছেন আবু নাছের। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এতে এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে। সরকারি পর্যায়ে ভ্যাকসিনসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’