শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

শাহরাস্তিতে ইটভাটার ভারী ট্রাক ও ট্রাক্টরের কারণে বেহাল ৩ কিলোমিটার সড়ক, ভোগান্তিতে লাখো মানুষ

মির্জা মানিক প্রকাশিত: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৯ পিএম
শাহরাস্তিতে ইটভাটার ভারী ট্রাক ও ট্রাক্টরের কারণে বেহাল ৩ কিলোমিটার সড়ক, ভোগান্তিতে লাখো মানুষ

সবুজের বুক ছিড়ে বয়ে গেছে ৩ কিলোমিটার সড়ক। যা স্থানীয়দের কাছে গ্রীন রোড নামে পরিচিত। তবে ভারী বর্ষণ ও ইটভাটার ভারী ট্রাক ও ট্রাক্টরের অতিরিক্ত চলাচলের কারণে এখন বেহাল দশা এই সড়কের।

চাঁদপুর শাহরাস্তি উপজেলা দক্ষিণ টামটা ইউনিয়ন ৮ নং ওয়ার্ডের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের দুপাশ জুড়ে রয়েছে সবুজের সমারোহ। দৃষ্টিনন্দন এই সড়কে ২০০৬ সালে সৌন্দর্যবর্ধনে গাছ লাগায় টামটা বহুমুখী সমিতি নামে একটি সামাজিক সংগঠন। এছাড়াও সরকারি পাকা রাস্তা না থাকায় এলাকাবাসীর নিজ উদ্যােগে নির্মাণ করা হয় সড়কটি। তবে এমন সড়ক নির্মাণ কিংবা সৌন্দর্যবর্ধন যেন ধ্বংসের মিশনে নেমেছে দুটি ইট ভাটা প্রতিষ্ঠান। ইট বহনকারী ট্রাক ও ট্রাক্টরের অতিরিক্ত চলাচলে কাঁদা মাখা সড়ক যেন এখন মৃত্যু ফাঁদ।

দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় সড়কে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ ও কোথাও কোথাও পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে হাঁটু সমান কাঁদা। এতে করে প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকার স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও রোগীবাহী যানবাহন চালকদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গড়ে ওঠা দুটি ইটভাটা থেকে নিয়মিতভাবে ভারী ট্রাক ও ট্রাক্টর চলাচল করে এই সড়ক দিয়ে। এসব যানবাহন ওজন বহন সীমার বাইরে থাকায় বর্ষায় সড়কের মাটি সরে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথায়ও আবার পানি জমে কাদায় পরিণত হয়েছে। তাতে বর্ষাকালে পথচলা হয়ে পড়ে ভয়াবহ। আবার শুষ্ক মৌসুমে ধুলায় নাকাল হয় পুরো এলাকাবাসী। ফলে চলাচল যেমন কষ্টকর, তেমনই দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে প্রতিনিয়ত।

Model Hospital

স্থানীয় বাসিন্দা মো. গোলাম সরওয়ার বলেন, এই রাস্তাটাই আমাদের একমাত্র চলাচলের পথ। কিন্তু রাস্তার যে অবস্থা, তাতে করে রোগী নিয়ে যেতে ভয় লাগে। অ্যাম্বুলেন্স অথবা রোগীবাহী গাড়ি পর্যন্ত ঢুকতে চায় না এলাকায়। যাদের কারণে সড়কের দুরবস্থা তাদের বার বার বলা হলেও কোন কর্নপাত করেনি। তারা আওয়ামিলীগের আমলেও এলাকার মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে এখনো করছে। তাহলে দেশ পরিবর্তনে এতো মানুষের জীবন দিয়ে লাভ কি হলো। এছাড়াও এভাবে ফসলি জমি নষ্ট করে ইট ভাটা গড়ে তোলা যায় কিনা আমার জানা নাই। তবে আমরা চাই আমাদের দীর্ঘ দিনের এই কষ্ট লাগব হোক।

একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সলিমুল্লাহ জানায়, ৫ বছর ধরে এই সমস্যায় ভুগছি। বৃষ্টি হলে আর দোকানে যাওয়ার নাম নিতে পারি না। শরীর খারাপ লাগলে ঔষধ কিনতে পারি না। আমরা গ্রামের মানুষদের রাস্তা মানেই জীবন। তবে এই রাস্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন আমাদের মরণের কারণ।

একজন স্কুলছাত্রী জানায়, প্রতিদিন স্কুলে যেতে গায়ে কাদা লাগে। অনেক সময় পড়ে গিয়ে ব্যথাও পাই। আমরা চাই এই অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে রাস্তা সংস্কার করে সীমাহীন ভোগান্তি থেকে আমাদের মুক্তি দেওয়া হোক।

সৌদি প্রবাসী শাহরাস্তি উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক তানজিল হোসেনের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে জানান, ৪ বছর আগেও একবার বৃষ্টির মধ্যে ইট ভাটার গাড়ি চলাচলে রাস্তাটি নষ্ট হয়। পরে আমি এলাকারবাসীর সম্মতিক্রমে গাড়ি গুলো সাময়িক বন্ধ রাখতে বলি। কিন্তু গাড়ি বন্ধ না রেখে উল্টো আমাকে প্রাণ নাশের হুমকি দেয় ইট ভাটার মালিক দুলাল মিয়াজি। শুধু তাই নয় স্বৈরাচারী সরকার আমলে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙ্গিয়ে এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করতো এই দুলাল। যা এখনো বিদ্যমান। তাই প্রশাসনের নিকট আকুল আবেদন এই ধরনের সমাজ বিনষ্টকারীদের আইনের আওতায় এনে এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।

এলাকাবাসী জানান, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হলেও এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিছু অংশে লোকজন নিজেরাই ইট ফেলে চলাচলের সাময়িক ব্যবস্থা করলেও তা যথেষ্ট নয়।

স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বারের ভাষ্যমতে, ইটভাটার গাড়ির কারণে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কথা সত্য। বার বার স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও। অজানা কারণে সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আবারও প্রশাসনের সাথে আলাপ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন ইউপি সদস্য।

সড়কটি আশপাশের কয়েকটি গ্রাম সহ প্রায় ১ লাখ মানুষজনের জন্য যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। এই সড়ক দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ হয়। কিন্তু বর্তমানে সেই সড়কই হয়ে উঠেছে দুর্ভোগের কারণ ও মৃত্যুপুরী।

এই বিষয়ে ইট ভাটা দুটির স্বত্বাধিকারী দেলোয়ার হোসেন মিয়াজির ছেলে হৃদয় মিয়াজি ও দুলাল মিয়াজির মুঠোফোনে একাধিক ফোন দিলেও, তা সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানায়।

স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে ভারী যানবাহনের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ ইট ভাটার গাড়ি অবাধ বিচরণ এবং দ্রুত সড়ক সংস্কারের ব্যবস্থা না নিলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে। সেই সঙ্গে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও করছেন সচেতন মহল।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’