শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

চাঁদপুরে ৭২ বছর ধরে হাদিয়া ছাড়া ১৬ মসজিদে খতমে তারাবি পড়ান হাফেজরা

অনলাইন ডেস্ক প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৪৪ এম
চাঁদপুরে ৭২ বছর ধরে হাদিয়া ছাড়া ১৬ মসজিদে খতমে তারাবি পড়ান হাফেজরা

সংগৃহীত ছবি

রমজানের পবিত্র রাতে কোরআনের সুরেলা তিলাওয়াতে মুখরিত হয় মসজিদগুলো। তবে চাঁদপুর সদরের বাগাদি ইউনিয়নের মমিনপুরে দীর্ঘ ছয় দশক ধরে চলে আসছে এক বিরল ঐতিহ্য। এখানে একটি নয়, বরং গ্রামের ১৬টি মসজিদে একযোগে খতমে তারাবি পড়ানো হয় কোনো প্রকার আর্থিক বিনিময় বা হাদিয়া ছাড়াই।

জানা যায়, ওই এলাকার ঐতিহ্যবাহী মমিনপুর মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম হাফেজ মাওলানা মুহসিন (র.)-এর সময় থেকে শুরু হওয়া এই অনন্য ঐতিহ্য আজও অটুট রেখেছেন মাদরাসাটির ছাত্র ও হাফেজরা। প্রতিবছর এ মাদরাসা থেকে হিফজ সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরাই মমিনপুর গ্রামের সবকটি মসজিদে খতমে তারাবি পড়ান। একেক মসজিদে দুই থেকে চারজন করে হাফেজ দায়িত্ব পালন করেন। চলতি বছর মাদরাসা মসজিদে খতমে তারাবি পড়াচ্ছেন হাফেজ মো. মাহমুদ ও হাফেজ ওবায়দা।

সরেজমিন ঘুরে ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী মমিনপুর মাদরাসা। চান্দ্রা-গল্লাক সংযুক্ত পাকা সড়ক থেকে উত্তর-পশ্চিমে সাহেব বাজার এবং পূর্ব দিকে মাদরাসার ক্যাম্পাস। নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত দ্বিতল মসজিদটিতে একসঙ্গে অন্তত ৫০০ থেকে ৬০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। খোলামেলা পরিবেশের কারণে মসজিদের ভেতরে বিরাজ করে প্রশান্ত, শীতল আবহ।

মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা কেফায়েত উল্লাহ জানান, জেলা সদরের বিভিন্ন মসজিদে তারাবি পড়ানো হাফেজদের হাদিয়া দেওয়া হলেও মমিনপুর মাদারাসা বরাবরই ব্যতিক্রম। প্রতিষ্ঠাতা মরহুম হাফেজ মাওলানা মুহসিন (র.)-এর সময় থেকে এখানে হাদিয়া নেওয়া-দেওয়ার প্রচলন নেই। সেই ধারা আজও অটুট। প্রায় ৭২ বছর ধরে (ছয় যুগ) একবিন্দু বিচ্যুত না হয়ে এই ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।

Model Hospital

হাফেজ মাহমুদ বলেন, দুই বছর ধরে এখানে তারাবি পড়াচ্ছি। কখনো হাদিয়া নিইনি। বিনিময়হীন এই ইবাদতে আলাদা এক তৃপ্তি আছে।একই অনুভূতির কথা জানান হাফেজ ওবায়দা, তিন বছর ধরে এখানে তারাবি পড়াচ্ছি। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়া ইবাদত করতে পারা সত্যিই সৌভাগ্যের।

১৯৮৮ সালে এই মাদরাসা থেকে হিফজ সম্পন্ন করা সদর উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের হাফেজ আব্দুল বারেক বলেন, এ প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য দেশজুড়ে। এখানকার হাফেজদের তারাবি পড়াতে আলাদা ইন্টারভিউ দিতে হয় না। শুধু কুরআন মুখস্থ করাই নয়, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায়ও এ মাদ্রাসা অনন্য। তার ভাষ্য, দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে হাজারো শিক্ষার্থী দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।

মাদসার মুহতামিম হাফেজ রাশেদ জানান, প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় মাদ্রাসা মসজিদে খতমে তারাবি পড়িয়েছেন চাচা হাফেজ ফজলুর রহমান। তার ইন্তেকালের পর শিক্ষার্থীরাই সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তারাবি শেষে মুসল্লিদের মিষ্টিমুখ করানোর মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাদের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব কিন্তু থেকে যায় ভালোবাসা, আস্থা আর আত্মিক বন্ধন।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’