শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

নোয়াখালীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ: কার্যালয়ে আগুন

অনলাইন ডেস্ক প্রকাশিত: রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬, ১:১৯ এম
নোয়াখালীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ: কার্যালয়ে আগুন

নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ঝটিকা বিক্ষোভ মিছিলের জের ধরে নোয়াখালী সদর উপজেলায় বিএনপি ও রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এক ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (৬ জুন) বিকেল চারটা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত উপজেলার কালাদরাপ ইউনিয়নের পশ্চিম শুল্লকিয়া গ্রামে এই রণক্ষেত্র তৈরি হয়।

সংঘর্ষ চলাকালে ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অফিস ঘর এবং বিএনপি কর্মীদের একটি মোটরসাইকেলে প্রকাশ্য দিবালোকে অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া পাল্টাপাল্টি ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় আওয়ামী লীগ সমর্থক ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান শাহদাত উল্যাহ সেলিমের বাড়ি এবং ছাত্রদল কর্মীদের পাঁচটি মোটরসাইকেল ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়।

এই উপদলীয় ও রাজনৈতিক সংঘর্ষে ইউপি চেয়ারম্যান শাহদাত উল্যাহ সেলিম এবং নোয়াখালী শহর শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হৃদয়সহ উভয় পক্ষের কমপক্ষে ১০ জন নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে শ্রমিক দলনেতা হৃদয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং বাকিদের স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ, প্রশাসন ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে সদর উপজেলার নোয়ান্নই ইউনিয়নের বাঁধেরহাট বাজারে আইন অমান্য করে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা একটি আকস্মিক বিক্ষোভ মিছিল বের করে। ওই নিষিদ্ধ মিছিলের তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জানিয়ে আজ শনিবার বিকেলে একই বাজারে ইউনিয়ন বিএনপি, অঙ্গ সংগঠন এবং জামায়াতে ইসলামীর ব্যানারে পৃথক পৃথক বিক্ষোভ মিছিল ও এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে বিএনপি ও জামায়াতের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ার পর সাধারণ নেতা-কর্মীরা যে যাঁর মতো বাঁধেরহাট বাজার ত্যাগ করছিলেন।

Model Hospital

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঠিক এই সময়ে বিএনপি ও ছাত্রদলের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা গোপন সূত্রে খবর পান যে, পাশের কালাদরাপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহদাত উল্যাহ সেলিমের নেতৃত্বে একদল আওয়ামী লীগ সমর্থক পশ্চিম শুল্লাকিয়া গ্রামের একটি দলীয় কার্যালয়ে বসে আরেকটি ঝটিকা মিছিলের গোপন প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে ছাত্রদলের একদল উত্তেজিত কর্মী ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়ির পাশের ওই অফিস ঘরের সামনে জড়ো হলে উভয় পক্ষের মধ্যে মুহূর্তের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়।

হামলার শুরুর দিকেই ধারালো অস্ত্রের আঘাতে শ্রমিক দলনেতা মো. হৃদয়ের মাথা ফেটে যায় এবং সমান্তরালভাবে চেয়ারম্যান শাহদাত উল্যাহ সেলিমও আহত হন। ঘটনার জেরে চেয়ারম্যানের অনুসারীরা ছাত্রদল কর্মীদের পাঁচটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে একটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়, যার বিপরীতে বিএনপি ও ছাত্রদল কর্মীরাও স্থানীয় আওয়ামী লীগের ওই কার্যালয়টি আগুনে পুড়িয়ে দেয়। সন্ধ্যায় নিজেদের শীর্ষ নেতা গুরুতর আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে জেলা শহর থেকে বিএনপি ও ছাত্রদলের আরও কয়েক শ ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মী ও সমর্থক কালাদরাপ ইউনিয়নে লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রবেশ করে ইউপি চেয়ারম্যান শাহদাত উল্যাহ সেলিমের বসতবাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। চেয়ারম্যানের ছোট ভাই আবির অভিযোগ করে বলেন, ‘ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা আমার ভাইকে অফিস থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা ও মারধর করলে এলাকাবাসী তাদের প্রতিরোধ করে। পরে সন্ধ্যায় তারা আমাদের বাড়িতে অন্যায়ভাবে ব্যাপক হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।’ অপরদিকে জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি রাশেদুল ইসলাম সোহাগ পাল্টাপাল্টি দাবি করে বলেন, ‘আমরা শহর অভিমুখে শান্তিমতো ফেরার পথে চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে আমাদের ওপর অতর্কিত কাপুরুষোচিত হামলা চালানো হয়েছে।’

ঘটনার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সুধারাম মডেল থানার বিপুল সংখ্যক পুলিশ এবং নোয়াখালী ক্যাম্প থেকে র‌্যাব-১১ এর সশস্ত্র সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি শান্ত করেন। ঘটনাস্থল থেকে সুধারাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘হামলা, ভাঙচুর ও দুটি পৃথক অগ্নিসংযোগের খবর পেয়ে আমি নিজে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে অবস্থান নিই। বর্তমানে পুরো এলাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত ও আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বেআইনিভাবে হামলা ও সরকারি আইন অমান্য করার ঘটনায় জড়িত উভয় পক্ষের অপরাধীদের ভিডিও ফুটেজ দেখে গ্রেপ্তারে পুলিশের বিশেষ চিরুনি অভিযান অব্যাহত আছে। ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগের আলোকে পরবর্তীতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’