শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

বাউল গানের মন্দিরা থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অক্টোপ্যাড শিল্পী মোঃ রাজুর অনন্য পথচলা

সাইদ হোসেন অপু চৌধুরী প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫১ পিএম
বাউল গানের মন্দিরা থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অক্টোপ্যাড শিল্পী মোঃ রাজুর অনন্য পথচলা

বাংলাদেশের যন্ত্রসংগীত জগতে নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও প্রতিভার এক উজ্জ্বল নাম মোঃ রাজু। টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর উপজেলার সখিপুর পৌরসভার বাসিন্দা এই গুণী শিল্পীর জন্ম ১৫ এপ্রিল ১৯৮৭ সালে। তাঁর পিতা মোঃ আশরাফ মিয়া ছিলেন একজন খ্যাতিমান বাউল ও বিচার গানের শিল্পী। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাউল সংগীত পরিবেশন করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। আর সেই পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকেই সংগীতের প্রতি ভালোবাসার জন্ম হয় মোঃ রাজুর।

মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে বাউল গানের আসরে মন্দিরা বাজানোর মাধ্যমে তাঁর সংগীতজীবনের সূচনা। পরবর্তীতে তিনি বেইজ গিটার শেখেন এবং প্রায় তিন বছর দেশের বিভিন্ন মঞ্চে বেইজ গিটারিস্ট হিসেবে সফলভাবে পারফর্ম করেন। এরপর তাঁর আগ্রহ তৈরি হয় আধুনিক পারকাশন যন্ত্র অক্টোপ্যাডে, যা পরবর্তীতে তাঁর সংগীতজীবনের মূল পরিচয়ে পরিণত হয়।

২০০৭ সালে তিনি অক্টোপ্যাডের শিক্ষক মোঃ শহিদুল ইসলাম-এর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তালিম গ্রহণ শুরু করেন। তাঁর সান্নিধ্যে দক্ষতা অর্জনের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত স্টেজ পারফরম্যান্স শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি দেশের প্রখ্যাত গুরুজি হানিফ আহমেদের কাছ থেকেও দীর্ঘ সময় অক্টোপ্যাডের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এছাড়া এশিয়ার অন্যতম খ্যাতিমান পারকাশন শিল্পী ও হৃদমের জাদুকর হিসেবে পরিচিত গুরুজি মানিক আহমেদের সান্নিধ্য লাভ তাঁর সংগীতজীবনকে আরও সমৃদ্ধ করে।

সংগীতের এই দীর্ঘ পথচলায় মোঃ রাজুর প্রথম আন্তর্জাতিক সফর ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের সঙ্গে একাধিক সফল স্টেজ পারফরম্যান্সে অংশ নেন। পরবর্তীতে দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী শারমিন দীপুর সঙ্গে একাধিকবার ভারতে সফর করে বিভিন্ন বৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ পান।

Model Hospital

এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের কিংবদন্তি ও জনপ্রিয় শিল্পীদের সঙ্গে একই মঞ্চে পরিবেশনার গৌরব অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন খুরশেদ আলম, ফেরদৌস ওয়াহিদ, তপন চৌধুরী এবং প্রয়াত সুবীর নন্দীসহ দেশের বহু স্বনামধন্য শিল্পী।

বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)সহ দেশের প্রায় সব বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে তিনি নিয়মিত সংগীত পরিবেশন ও লাইভ অনুষ্ঠানে যন্ত্রসংগীতশিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন। দেশের বরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি বর্তমান প্রজন্মের অসংখ্য জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

বিশেষ করে ক্লোজআপ ওয়ান তারকা লায়লার সঙ্গে টানা চার বছর ‘প্রাণের টিম ভালোবাসার টিম’ ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে সারা দেশে অসংখ্য বড় মাপের স্টেজ শোতে অংশ নেন। এছাড়াও ক্লোজআপ ওয়ান তারকা লালনকন্যা নাসরিন আক্তার বিউটি, নোলক বাবু, গামছা পলাশ, মিজান রাজিব, তামান্না হক, হিরো ফকির, শফি মণ্ডল, আশিক, বাঁধন মোদক, দিতি সরকারসহ বর্তমান সময়ের প্রায় সব জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে সফলভাবে মঞ্চে পারফর্ম করেছেন।

২০১৭ সালে মোঃ রাজু সরকারি তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর থেকে তিনি বিটিভির বিভিন্ন আয়োজনে দেশের গুণী সংগীতশিল্পী ও যন্ত্রসংগীতশিল্পীদের সঙ্গে নিয়মিত সংগত করে আসছেন।

সংগীতাঙ্গনে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের যন্ত্রসংগীত শিল্পীদের সরকারি নিবন্ধিত সংগঠন বাংলাদেশ মিউজিসিয়ান্স ফাউন্ডেশন (বিএমএফ)-এর ২০২২ ও ২০২৫ সালের কেন্দ্রীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রচার সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি প্রখ্যাত গুরুজি বিকাশ রায়ের কাছে অ্যাকোস্টিক ড্রামসের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন।

নিজের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সম্পর্কে মোঃ রাজু বলেন, “আমি একজন আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রসংগীতশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। সংগীতের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে আরও উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরাই আমার স্বপ্ন।”

পারিবারিক ঐতিহ্য, নিরলস সাধনা, দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের মঞ্চ অভিজ্ঞতায় মোঃ রাজু আজ দেশের যন্ত্রসংগীত অঙ্গনের একজন সুপরিচিত মুখ। তাঁর এই সাফল্যের যাত্রা নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’