শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

উপ পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান এর তত্ত্বাবধানে

চাঁদপুর ১৮ মাসে মাদক নির্মূলে অন্তহীন বিশেষ অভিযান

সাইদ হোসেন অপু চৌধুরী প্রকাশিত: সোমবার, ৩ মার্চ, ২০২৫, ১০:২২ পিএম
চাঁদপুর ১৮ মাসে মাদক নির্মূলে অন্তহীন বিশেষ অভিযান

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাজ হলো দেশকে মাদকমুক্ত করা। আর মাদকাসক্তি এক ভয়াবহ মরণব্যাধি। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যে সকল সমস্যা বিদ্যমান তার একটি অন্যতম সমস্যা হচ্ছে মাদকের ভয়াল থাবা।

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চাঁদপুর জেলায় সহকারী পরিচালক হিসেবে মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান যোগদান করেন। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তাকে একই কর্মস্থলে উপ-পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। যোগদানের পর থেকে আস্তে আস্তে পাল্টে যেতে থাকে চাঁদপুরের পুরনো সব দৃশ্যপট। চাঁদপুরের ৮ উপজেলায় এখন শুধু মাদক নির্মূলের পথেই নয় বরং মাদক প্রবণতার অপরাধ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার প্রচেষ্টায় আইন শৃঙ্খলারও অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়ে সর্বত্র যেন শান্তির সুবাতাস বইছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায় গেল ১৮ মাসে ২ হাজার ৩৫২টি অভিযানে ২২৪০ পিছ ইয়াবা, ১৮৪ কেজি গাঁজা, ১৭ বোতল বিদেশী মদ, ৩৩ হাজার ৩৮০ নগদ অর্থ, ১৭৬ জন মাদক কারবারীকে গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে ১৬৭টি মামলা দায়ের করতে সক্ষম হয়েছেন। এর সাথে মাদক পরিবহনের দায়ে ২টি প্রাইভেট কার, ১টি মিনি পিকআপ, ১টি মোটর সাইকেল এবং ১৭ টি মোবাইল সেট এবং মাদকের সাথে ৪৮ টি ইমিটেশন চেইন, ৫৯ টি কানের দুল ও ১০টি চোখের কাজল পেন্সিল জব্দ করা হয়েছে।

সোমবার (৩ মার্চ) এক সাক্ষাৎকারে মাদক নির্মূলের সাফল্যে চাঁদপুরের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছি বলেই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। ‘কেউ অপরাধ করলে ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। মাদক সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়। সারা পৃথবীতে এখন মাদক একটি বড় সমস্যা। মাদকে আসক্তির ফলে ধীরে ধীরে একটি সম্ভাবনাময় জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। উঠতি বয়সের তরুণেরা, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে মেয়েরাও কৌতূহলবশত বা ঠুনকো কারণে মাদকের ছোবলে জড়িয়ে পড়ছেন। নিয়মিত খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে এর থেকে দূরে থাকা সম্ভব।কেবলমাত্র আইন প্রয়োগ করে নয়, মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও ব্যক্তি পর্যায়ে শক্ত মনোবল।

Model Hospital

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বলেন, সাময়িক আনন্দ লাভের জন্য বা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল হয়নি বা পরিবারে বাবা-মায়ের ঝগড়া-বিবাদ—এসব থেকে মাদকের প্রতি প্রায়শই আসক্তি তৈরি হয়। প্রথমে এটা মানসিক চাহিদা তৈরি করে। তারপর শারীরিক চাহিদার দিকে ঝুঁকতে থাকে এবং একপর্যায়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। এ সময় বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের বর্ণনা দিয়ে প্রতিটির কুফল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হয় মর্মে জানান তিনি। তিনি বলেন, সুচিকিৎসা ও ভালোবাসার মাধ্যমে যে কাউকে মাদক থেকে মুক্ত করা সম্ভব।

মাদকাসক্তির ভয়াবহতা নিয়ে দেশজুড়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। মাদক এখন গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে গেছে তাই সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টার পাশাপাশি সামাজিকভাবে একে মোকবেলা করা জরুরি। পাড়া–মহল্লা থেকে সচেতনতা তৈরি করতে না পারলে মাদকের বিস্তৃতি রোধ করা যাবে না। মাদকাসক্তির ফলে মানুষের হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ,বেড়ে যায়। এছাড়া অনেকের ক্ষেত্রে অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, অতিরিক্ত ঘুম সহ নানা ধরণের মানসিক সমস্যা তৈরী হয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, একবার আসক্ত হয়ে পড়লে তাকে মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এ ব্যাপারে পরিবারকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। একটি পরিবারে বা সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিই যথেষ্ট। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি শারীরিক, মানসিক, আর্থিক, পারিবারিকসহ নানা ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। শারীরিক প্রভাবের মধ্যে রয়েছে—মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া, হঠাৎ চোখে কম দেখা, মুখ ও নাক লাল হওয়া, যৌনশক্তি কমে যাওয়া, মুখমণ্ডলসহ সারা শরীরে কালশিরে পড়া, হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া, বুক ও ফুসফুস নষ্ট হওয়া, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, চর্ম ও যৌন রোগ বৃদ্ধি পাওয়া, সংক্রামক রোগ বৃদ্ধি, স্মৃতিশক্তির কোষ ধ্বংস করা। মাদক গ্রহণে শারীরিকভাবে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেমন—অনিয়মিত মাসিক, জরায়ুর বিভিন্ন প্রকার রোগ, নারীর প্রজননক্ষমতা হ্রাস পাওয়াসহ বিভিন্ন যৌনরোগ দেখা দেয়। সম্প্রতি মাদকাসক্তদের মধ্যে এইডস দেখা দিচ্ছে বলে মনে করেন চিকিসৎকরা। মানসিক ক্ষতির একটা বড় রূপ রয়েছে, যা সব সময় বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয় যেমন—পাগলামি করা, মাথা ঘোরা ও খিটখিটে মেজাজ, অলসতা ও উদ্বেগ, হতাশাগ্রস্ত হওয়া, স্নেহ-ভালোবাসা কমে যাওয়া ইত্যাদি।

উপপরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাদকাসক্তির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে। কারণ যে পরিবারে মাদকাসক্ত ব্যক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, সে পরিবারে কোনো সুখ-শান্তি থাকে না। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের অলংকার ও টাকা-পয়সা চুরি করে আর সেটা না পারলে আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে জোর করে অস্ত্র দেখিয়ে অর্থ নিয়ে তার চাহিদা মেটায়। সমাজে চলে চরম বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক। বর্তমানে দেশের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেও এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার ও সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’