শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

চাঁদপুর জেলা পুলিশের অভিযানে গত ৩ মাসে ১০৩ জন কিশোর গ্যাং ও ডাকাত আটক

সাইদ হোসেন অপু চৌধুরী প্রকাশিত: রবিবার, ২৩ মার্চ, ২০২৫, ১১:১৯ পিএম
চাঁদপুর জেলা পুলিশের অভিযানে গত ৩ মাসে ১০৩ জন কিশোর গ্যাং ও ডাকাত আটক

মাদক সেবন, বড় ভাইদের নির্দেশনা অনুযায়ী মিটিং মিছিল, এলোমেলো ভাবে দ্রুত গতিতে দামি মোটরসাইকেল হাকানো, বিভিন্ন ডিজাইনের চুল কাটা এবং চুলে কালার করা কিশোররাই মূলত কিশোর গ্যাং-এর সদস্য।

পাড়া মহল্লায় মারপিট, কারণে-অকারণে যাকে তাকে মারধার, দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মহড়া, দলবদ্ধভাবে আড্ডা দেয়া, বড়দের সম্মান না দেয়া এদের অভ্যাসে পরি ণত হয়েছে। কিশোর গ্যাং ও ডাকাত রীতিমত এদের নিয়ে আতঙ্কে ছিলেন চাঁদপুরবাসী।

তবে এদেরকে ভালোভাবে চেনা যায় চুলের কাটিং আর হাতে ব্রেসলেট। এরা জানেনা তাদের ভবিষৎ কি? অল্প বুদ্ধির এই ছোট মানুষগুলিকে এক শ্রেণীর নেতা, পাতি নেতা, পাড়া মহল্লার বড় ভাই এবং রাজনৈতিক নেতারা ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। এতে আবেগপ্রবণ এই কিশোররা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাং ও ডাকাত আটক করতে সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে চাঁদপুর জেলা পুলিশ।

Model Hospital

চাঁদপুর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় স‍ূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত চাঁদপুর জেলায় ৭১ জন কিশোর গ্যাং এবং ৩২ জন ডাকাত গ্রেফতার করেছে চাঁদপুর জেলা পুলিশ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁদপুরের অধিকাংশ এলাকায় কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার নেপথ্যে স্থানীয় বড় ভাইয়েরা মদদ দিচ্ছেন। পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্ধ দ্বন্ধ, প্রেমে বিরোধ, মাদকসহ নানা অপরাধে কিশোররা খুনের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় ‘বড় ভাই’রা। এলাকার পরিত্যাক্ত ভবন অথবা যে কোনো জায়গায় তাদের রয়েছে নিজস্ব চেম্বার।

চাঁদপুরে কিশোর গ্যাং ও ডাকাত সম্পর্কে পুলিশের কার্যক্রম জানতে চাইলে, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব পিপিএম জানান, চাঁদপুরে আমরা কিশোর গ্যাং-এর তালিকা করেছি। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশকিছু তালিকাভুক্ত কিশোর গ্যাং-এর সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে যাদের বয়স একেবারেই কম তাদের মা-বাবাকে ডেকে সতর্কতামূলক পরামর্শ দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর যারা বিভিন্ন অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও কিশোর গ্যাং- ও ডাকাত নিয়ে বিটপুলিশিং কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন থানা এলাকায় সচেতনতা মূলক বৈঠক এবং প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, কিশোর গ্যাং ও ডাকাত নিয়ন্ত্রনে নানা ধরণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

গ্রেফতারকৃতরা পেশাদার ডাকাত ও ছিনতাইকারী। তাদের বিরুদ্ধে প্রত্যেকের নামে একাধিক ছিনতাই-চুরির মামলা রয়েছে।

তাছাড়া কিশোর গ্যাং-এর অপরাধ দমনে প্রতিটি থানা এলাকায় অভিযান অব্যাহত আছে। পুলিশের পাশাপাশি মা-বাবাদের ও সচেতন হতে হবে। কিশোর ছেলের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

পুলিশ সুপার বলেন, একটি পরিবারের প্রবীণদের উচিত অপ্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা, নৈতিকতা শেখানো এবং তাদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখা। স্কুল কারিকুলামের বাইরে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আকৃষ্ট করা এবং যুক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে। কিশোর অপরাধ রুখতে ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। যারা ইতোমধ্যে অপরাধ চক্রে জড়িয়ে গেছে, তাদের সুপথে নিয়ে আসতে উপযুক্ত কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি বলেন, মা-বাবা যদি তার সন্তান সারাদিন কোথায় ছিল, কার কার সঙ্গে ছিল, কার সঙ্গে মেলামেশা করে এগুলো যদি মা-বাবারা সবসময় খেয়াল রাখেন তাহলে পরিবারের সন্তান বিপদে যেতে পারে না, কোনো সন্তান অপরাধ করতে পারে না। পরিবারের সন্তান ভালো ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে শুধু পরিবারে শান্তি বিরাজ করে না, এলাকায়ও শান্তি-শৃঙ্খলা বিরাজ করে। তখন তারা দেশের সম্পদে পরিণত হয়। তাই এলাকায় কিশোর অপরাধ মুক্ত করতে পরিবার ও সমাজের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। যেখানে অপরাধ হওয়ার আশংকা থাকে, সে বিষয়গুলো সাথে সাথে প্রশাসনকে জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চাঁদপুর পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব জেলাকে যেকোনো অপরাধমুক্ত করতে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’